উন্নয়নের নামে লুটপাটের মহোৎসব—প্রশ্নের মুখে পিডি ও ঠিকাদার!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৫-১১-২০২৬ ১২:০০:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৫-১১-২০২৬ ১২:০০:৫৪ অপরাহ্ন
চট্টগ্রামের কালুরঘাট-চাক্তাই সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেও নির্মাণকাজের গুণগত মান ও অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, উপকরণ ক্রয়ে অনিয়ম, নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণে অসংগতি এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখন বিতর্কের মুখে।
২ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা প্রাথমিক ব্যয়ে ২০১৭ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৬৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছরেও প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি হিসাবে ভৌত অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ৮০ শতাংশ হলেও বিভিন্ন এলাকায় অসমাপ্ত কাজ ও নির্মাণগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
নির্মাণসামগ্রীতে অনিয়মের অভিযোগ
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হচ্ছে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিয়ে। নতুন পাথর ও নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহারের বরাদ্দ থাকলেও বিভিন্ন স্থানে পুরোনো ভবনের ভাঙা পাথর, ইটের খোয়া ও নির্মাণবর্জ্য ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে বাঁধের মাটি ভরাটে নদী খনন থেকে উত্তোলিত বালু ও কাদামাটি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
নালা নির্মাণে রডের পুরুত্বে অসংগতি এবং রাস্তার নিচের স্তরে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যাদেশে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। প্রকল্পের উপকরণ ক্রয়ের বিল, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং ল্যাব পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যয় বৃদ্ধি ও কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৪৬৯ কোটি টাকা বাড়লেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। একদিকে আর্থিক অগ্রগতি ৮৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে এখনো বেশ কিছু স্থানে অসমাপ্ত কাজ রয়েছে। ফলে বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং কাজের পরিমাণের সঙ্গে বিল পরিশোধের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে নিরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ঠিকাদারি বিল, উপকরণ সরবরাহ, কাজের পরিমাপ এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ক্ষতিপূরণ ও জমি অধিগ্রহণে বৈষম্যের অভিযোগ
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়েও ভুক্তভোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একই এলাকার কাছাকাছি স্থাপনার ক্ষেত্রে কোথাও ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও অন্যদের দুই থেকে তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষতিগ্রস্ত এখনো প্রাপ্য অর্থ পাননি।
এ ছাড়া ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ে মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব, অর্থ দাবি এবং সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অধিগ্রহণের মূল নথি, মালিকানার দলিল, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও অর্থ ছাড়ের হিসাব তদন্ত করা প্রয়োজন।
নকশা পরিবর্তন ও প্রকল্প তদারকিতে দুর্বলতা
নতুন ব্রিজ এলাকায় অনুমোদিত নকশার পরিবর্তে সড়কের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।নোমান কলেজসংলগ্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত জটিলতায় কাজ আটকে আছে। আবার কয়েকটি এলাকায় অনুমোদিত কালভার্ট বাদ দিয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। প্রকল্পের নকশা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ব্যয় ও কার্যকারিতায় কী প্রভাব পড়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের কাজের মান, উপকরণ পরীক্ষা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশ প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা লোপাট করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক পিডি ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিব দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়াশব্দ মেলেনি।
এদিকে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন অতীতের উন্নয়নকাজে গুণগত মানের ঘাটতির কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে সড়কের ওপরের অংশ ভালোভাবে নির্মাণ করা হলেও নিচের স্তরের কাজে যথাযথ মান বজায় রাখা হয়নি। বর্তমান সময়ে নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করতে নকশা, পরিমাপ ও উপকরণ ব্যবহারে তদারকি বাড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
স্বচ্ছ তদন্তই পারে প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে
কালুরঘাট-চাক্তাই প্রকল্প কেবল একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নয়, এটি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন, নদীতীর সংরক্ষণ ও নগর যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই প্রকল্পে ওঠা অনিয়মের অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যয়, ঠিকাদারি কার্যক্রম, উপকরণ ক্রয়, ল্যাব পরীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা হওয়া দরকার। পাশাপাশি সরেজমিনে নির্মাণকাজের মান যাচাই করে ত্রুটিপূর্ণ কাজ চিহ্নিত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ঠরা বলেন, প্রকল্পের প্রতিটি টাকার হিসাব এবং প্রতিটি নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করা না গেলে বিপুল সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং অবশিষ্ট কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স